দৃঢ় পায়ে ফাঁসির মঞ্চে - JONOPRIO24

Breaking

Post Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

সোমবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১৫

দৃঢ় পায়ে ফাঁসির মঞ্চে

জনপ্রিয় অনলাইন ডেস্ক : মঞ্চ প্রস্তুত। জমটুপি পরানো হলো। তাড়া দিচ্ছেন দায়িত্বশীলরা। তবুও ভাবলেশহীন। অবশেষে কালেমা, দোয়া-দরুদ পড়তে পড়তে কনডেম সেল থেকে রক্ষীদের সহায়তায় ধীর পায়ে ফাঁসির মঞ্চে গিয়ে উঠেন মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত বিএনপি নেতা জাতীয় সংসদের ৬ বারের নির্বাচিত সাবেক এমপি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। মৃত্যু আসন্ন, ফাঁসি নিশ্চিত জানার পরও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই; অনুশোচনা নেই তার মধ্যে। প্রায় অভিন্ন ঘটনা জামায়াতের নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। মুজাহিদ দুই মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছেন। আল্লাহর কাছে দোয়া চাইতে বলেছেন। তবে সালাউদ্দিন নাতি-নাতনিদের দেখে আবেগআপ্লুত হয়ে পড়লেও দৃঢ়তা নিয়েই ছেলেকে বলেছেন, তোমার ৬ ফুট ২ ইঞ্চি বাবা কারো কাছে মাথা নত করে না। একদিন আল্লাহ এর বিচার করবে। ফাঁসি কার্যকরের সময় উপস্থিত ছিলেন এমন একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। অবশ্য এ সময় আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মিডিয়া কর্মী ছাড়া জেল গেট সবার জন্য নিষিদ্ধ করা হলেও গণজাগরণ মঞ্চের নেতাকর্মীরা সেখানে ফাঁসির দাবিতে মিছিল করে; মিছিলের পর উল্লাস করে এবং মিষ্টি বিতরণ করে। বাইরে যখন প্রেসিডেন্টের কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়া না চাওয়া নিয়ে বিতর্ক চলছে; স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আর আইন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দৌড়ঝাঁপ এবং বঙ্গভবনের দিকে সবার চোখ; তখন আইজি প্রিজন অফিস থেকে জেল কর্তৃপক্ষকে ফাঁসির যাবতীয় প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। কারাগারের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, অন্যান্য দিনের চেয়ে একটু আগেই সাধারণ কয়েদীদের লকাপে নেয়া হয়। রাত সাড়ে ৮টার দিকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে গোসল করানো হয়। অতঃপর তারা নিত্যদিনের মতোই এশার নামাজ আদায় করেন। রাত ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে খেতে দেয়া হয় রাতের খাবার। খাবারের মেন্যুতে ছিলো ভাত, ডাল, সবজি,  মাছ ও মুরগি। খাবার দেয়ার পর প্রথমে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী জানান, তিনি খাবেন না। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ যখন জানায়, এটাই তাদের শেষ খাবার; তখন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সামান্য খাবার খান, কিন্তু আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ খাবার স্পর্শ করেন নি। পাশাপাশি সেল হলেও দুই সেলের মুখ দুই দিকে হওয়ায় দুই জন কেউ কাউকে দেখতে পারেন নি। তবে দুই জনই সব সময় লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ পড়তে থাকেন। কারা সূত্র জানায়, অন্যান্য দিনের চেয়ে শনিবার রাতে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদচারণা ছিল বেশি। রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে শেষবারের মতো দেখা করতে কারাগারে প্রবেশ করেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর স্ত্রী-পুত্রসহ পরিবারের ২২ সদস্য। তারা ১০টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত কারাগারে অবস্থান করেন। সাক্ষাৎ শেষে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী জানান, তাঁর বাবার মনোবল দৃঢ়। তিনি আমাদের চিন্তা না করার পরামর্শ দিয়েছেন। ভবিষ্যতে পরিবার কিভাবে চলবে সে সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। প্রেসিডেন্টের কাছে মার্সি পিটিশন প্রসঙ্গ তুলতেই বাবা বলেছেন, এসব (প্রাণভিক্ষা) কথা, কে বলেছে? এ সরকারের সময় কত কাগজ বের হবে। ৬ ফুট ২ ইঞ্চি তোমার বাবা আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে  মাথা নত করে না। এ সরকার আমাকে নির্বাচনে হারাতে পারবে না জেনে ফাঁসি দিচ্ছে। সূত্র জানায়, স্ত্রীকে সাহসী হওয়ার পরামর্শ দিলেও নাতি-নাতনিদের জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণের জন্য আবেগআপ্লুত হয়ে পড়েন। পরে নিজেকে সামলে নিয়ে স্বভাবসুলভ ভাষায় আল্লাহ যা করেন ভালই করেন উল্লেখ করে সকলকে শক্ত হওয়ার পরামর্শ দেন। ফাঁসির আগে শনিবার রাত ১২টা ২০ মিনিটে কারাগারে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তার স্ত্রী-পুত্র-ভাই সব পরিবারের সদস্যরা। মুজাহিদ জানান, তিনি ইসলামী আন্দোলন করেন। এ সময় তার পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। সেখানে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। দুই মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন মুজাহিদ। সাক্ষাৎ শেষে বেরিয়ে তার ছেলে আলী আহমদ মাবরুর সাংবাদিকদের বলেন, প্রেসিডেন্টের কাছে আমার বাবার প্রাণভিক্ষার কথাটি সম্পূর্ণ মিথ্যাচার। বাবা আমাদের বলেছেন, তিনি প্রাণভিক্ষা চান নি। উনার সম্পর্কে প্রশাসন মিথ্যাচার করেছে। তিনি কোনো মার্সি পিটিশন করেন নি। দেশের কাছে, দলের কাছে, পরিবারের কাছে হেয় করা ও কাপুরুষ বানানোর জন্য এই মিথ্যাচারের নাটক তৈরি করা হয়েছে। বাবা বলেছেন, এ জালিম সরকারের কাছে আমার প্রাণভিক্ষা চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এই সরকার গত ৫ বছর আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগে মিথ্যা মামলা দিয়ে মিথ্যাচার করেছে। এই শেষ মুহূর্তে এসেও তারা মিথ্যাচার অব্যাহত রেখেছে। মূলতঃ আমাকে আমার দলের কাছে, আমার পরিবারের কাছে, দেশের মানুষের কাছে হেয় করার জন্য কাপুরুষ বানানোর জন্য তারা এ মিথ্যা অপপ্রচারের নাটক করেছে। দুই পরিবারের সদস্যরা কারাগার থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর কালেমা, দোয়া-দরুদ পড়তে শুরু করেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। তারা নফল নামাজও আদায় করেন। তাদের তওবা পড়ানো হয়। তওবা পড়ান কারাগার পুকুর পাড় সংলগ্ন মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা মনির হোসেন খান। ইমাম কনডেম সেলে গেলে তারাই (সালাউদ্দিন-মুজাহিদ) প্রথম সালাম দেন। ইমাম ওজু করতে বললে তারা দুজনই জানান ওজু করতে হবে না। একটু আগে নামাজ পড়েছি; ওজু আছে। রাত সাড়ে ১২টায় তাদের দুজনকে তওবা পড়িয়ে জমটুপি পরানো হয়। এরপর স্বাভাবিকভাবেই তারা দুজন রক্ষী ও জল্লাদদের সহায়তায় ধীর পায়ে হেঁটে ফাঁসির মঞ্চে যান। প্রথমে ওঠানো হয় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে। অতঃপর উঠানো হয় মুজাহিদকে। ১২টা ৫৫ মিনিটে একই মঞ্চে, পাশাপাশি, একই সময়ে একই সঙ্গে তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর প্রথমে মুজাহিদের ও পরে সালাউদ্দিনের লাশ নামানো হয়। এরপর নিয়ম অনুযায়ী লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে শরিয়ত অনুযায়ী গোসল করানো হয়। অতঃপর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই কফিন এ্যাম্বুলেন্সে তুলে রাত ২টা ৫৫ মিনিটে নিজ নিজ গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে লাশ পাঠানো হয় কঠোর নিরাপত্তায়। সূত্রের দাবি, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের পরিবারের সদস্যরা যখন কারাগার থেকে বের হয়ে গাড়িতে ওঠেন তখন তাদের ওপর কে বা কারা হামলা করেন। তবে উপস্থিত র‌্যাব ও পুলিশ সদস্যরা হামলাকারীদের প্রতিহত করে তাদের গাড়ীতে তুলে দেন। ফাঁসির সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন এমন এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ১২টা ৩৬ মিনিটে কনডেম সেল থেকে যমটুপি পরিয়ে দুজনকে ফাঁসির মঞ্চে নেয়া হয়। চারজন করে আটজন জল্লাদ দুজনকে ধরে মঞ্চে ওঠান। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিসি) উপকমিশনার (ডিবি) নাজমুল হোসেন রাতেই জেল গেইটে উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, প্রধান জল্লাদ শাহজাহান একযোগে দুজনের ফাঁসি কার্যকর করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন দুজন ম্যাজিস্ট্রেট, ঢাকার জেলার ডিসি, একজন ইমাম, সিভিল সার্জন। ফাঁসির মঞ্চে ওঠানোর সময় তাদের মধ্যে কোনো রিঅ্যাকশন ছিলো না। তাদের দাঁড় করানো হয় একই মঞ্চে পাশাপাশি। মঞ্চটি বেশ পুরনো। তবে যমটুপি পরিহিত থাকায় কেউ কাউকে দেখতে পারেন নি। তবে সর্বক্ষণ দুজনই দোয়া-দরুদ পড়েছেন। পরে কারা চিকিৎসক ডা. বিপ্লব কুমার ও আহসান হাবিব, ঢাকা জেলার সিভিল সার্জন আবদুল মালেকের তত্ত্বাবধানে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পরও নিয়ম অনুযায়ী এ সময় শুধু তাদের ঘাড়ের রগ কাটা হয়। এ মঞ্চেই কার্যকর করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের ফাঁসি। ডিএমপি কমিশনারের প্রতিনিধি ডিসি-ডিবি (নর্থ) শেখ নাজমুল আলম সাংবাদিকদের জানান, ফাঁসি কার্যকরের আগে তারা দুজনেই দোয়া কালাম পড়তে পড়তে ফাঁসির মঞ্চে ওঠেন। ফাঁসির মঞ্চে উঠতে বলা হলে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও মুজাহিদ দুজনেই শান্তভাবে ফাঁসির মঞ্চে ওঠেন। একদম নির্বিকারভাবে দুজনই দোয়া-কালাম পড়তে থাকেন। এসময় তারা কোনো উতপ্ত বাক্যবিনিময় করেন নি। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর লাশ দাফনের পর গতকাল তার ছেলে হুম্মাম কাদের বলেন, আমরা নিজেদেরকে ভাগ্যবান মনে করছি। দেশের এখন এমন পরিস্থিতি, অনেক রাজনীতিবিদ খুন-গুম হচ্ছেন। অনেকে আপনজনের লাশ খুঁজে পাচ্ছেন না। আমরা সম্মানের সঙ্গে বাবাকে দাফন করতে পেরেছি। আমার বাবা চট্টগ্রামের সিংহপুরুষ। কখনো তিনি ক্ষমা চাননি বা মাথানত করেননি। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Top Ad

Responsive Ads Here