নারী নির্যাতন ও আমাদের মূল্যবোধ - JONOPRIO24

Breaking

Post Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫

নারী নির্যাতন ও আমাদের মূল্যবোধ

মোঃ কামরুজ্জামান : বাংলাদেশে আজ প্রতিনিয়ত নারীরা হচ্ছেন নির্যাতিত, ঘরে ও বাইরে সর্বক্ষেত্রে নারীরা শিকার হচ্ছেলাঞ্চনার। সংবাদ  পত্রের পাতা খুললেই কিংবা টেলিভিশনে চোখ রাখলেই দেখা যায় নারী নির্যাতনের বিভৎস চিত্র । এই সমাজে এসিড সন্ত্রাস, যৌতুক, ধর্ষণ, অপহরণ ঘটে চলেছে নির্বিঘ্নে। প্র্রকৃতপক্ষে নারীর গণতান্ত্রিক সকল অধিকার রক্ষা সর্বক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাদায়িত্ব সরকারের, পাশাপাশি আপনার আমার সমাজের সর্বস্তরের সচেতন মানুষের। কিন্তু এই দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন  না হওয়ায়, দুষ্কৃতিকারীদের  পরোক্ষ ভাবে নারীউপর নির্যাতনে উৎসাহ প্রদান করা হচ্ছে। এর জন্য দায়ী শুধু সরকার নয়, আমরা সকলেই। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, মায়া-মমতা, একের দুঃখে অন্যের দুঃখী হওয়া, নির্যাতিতের পাশে দাঁড়ানো, সংঘবদ্ধ হয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মতো মানবিক গুণগুলো যেন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায় ইভটিজিং এর ঘটনা, এর কারণে অনেক সময় ঘটছে আত্মহত্যার ঘটনা। নারী নির্যাতনের যে ভয়াবহ রূপটি ব্যক্তিগত ও সমাজ জীবনের ওপর মারাত্মক ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলে, সেটি হচ্ছে শ্লীলতাহানী। দুষ্কৃতিকারীরা নারীদের শুধু ধর্ষণের মত ঘৃণিত কাজ করেই ক্ষান্ত হয়না, অনেক ক্ষেত্রে নিষ্ঠুর নির্দয়ভাবে খুন করে। এছাড়াও কখনো কখনো আপনজন দ্বারা নারী ধর্ষিত হচ্ছেন। লোক লজ্জার মুখে নিজের সম্ভ্রম হারিয়ে অনেক নারী এরপর জীবন বিসর্জন দিচ্ছেন বা ঘটনা ধামা চাপা দেওয়ার জন্য আপনজনেরাই নির্যাতিতকে হত্যা করছেন।  বর্তমানে নারী নির্যাতন পরিবার ও সমাজে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। যৌতুকের জন্য, ফতোয়ার শিকার হয়ে, স্বামীর পরকীয়ার কারণে, ধর্ষণ কিংবা গণধর্ষণের শিকার হয়ে, শ্বশুর বাড়ীর অত্যাচার-নির্যাতনে এ দেশের অনেক অসহায় নারীর প্রাণ চলে গেছে, এখনো যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নারীরা নিজ পৈত্তিক পরিবারের কারনেও নির্যাতিত হচ্ছেন, অনেক কিছু  পরিবারের মুখের দিকে তাকিয়ে, পরিবারের মান রক্ষায় স্বামীর সংসার ভালবাসা সব কিছু বিসর্জন দিচ্ছেন। সব নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা মানব সমাজকে পীড়া দেয়। মনুষ্যত্বের সঙ্গে নৈতিকতার সম্পর্ক বিদ্যমান। মানুষের জীবনের সাধনা হচ্ছে মনুষ্যত্ব অর্জনের চেষ্টা। মানুষের জীবনকে যথার্থ সৌন্দর্যময় ও সাফল্যমণ্ডিত করে তার নৈতিক মূল্যবোধ। কিন্তু দিন দিন নারী নির্যাতনের যে ভয়াবহ ব্যাধি আমাদের সমাজে বাসা বেঁধেছে, তাতে বর্তমান সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটছে। হিংস্রতা, নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা, অন্যায়ের প্রতিবাদ না করা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ স্থান করে নিয়েছে এবং পরিবার ও সমাজ এক চরম অস্থিরতার মধ্যে নিপতিত হয়েছে। আপাতত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, যতদিন পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর সামগ্রিক সত্তার বিকাশ না ঘটবে এবং সেভাবে তাকে মূল্যায়ন না করা হবে ততদিন নারীর মুক্তি নেই। শুধু সাধারণ মানুষ নয়,পুলিশ ছাড়াও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে অহরহ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দ্বারা নারী নির্যাতনের ঘটনা নিঃসন্দেহে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। মানবাধিকার সংস্থা, সুশীল সমাজ ও বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ উদ্বেগ প্রকাশ  করলেও দেশে এমন পরিস্থিতি বিরাজ করছে যেন দেখার কেউ নেই ।বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীরা বেশী নির্যাতিত হচ্ছে।      

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। অধিকারের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০১৫ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৫৮ জন।এর মধ্যে নারী ও শিশু সহ গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৬ জন, ধর্ষণের পর খুন হয়েছেন ২০ জন, ধর্ষণের পর আত্মহত্যার ঘটনা  ঘটেছে জন।২০১৪ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৬৬৬ জন, এর মধ্যে নারী ও শিশু সহ গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২২৭ জন, ধর্ষণের পর খুন হয়েছেন ৬৬ জন, ধর্ষণের পর আত্মহত্যার ঘটনা  ঘটেছে ১২ জন।২০১৩ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৮১৪ জন, এর মধ্যে নারী ও শিশু সহ গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৩৬ জন, ধর্ষণের পর খুন হয়েছেন ৭১ জন,ধর্ষণের পর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে জন।২০১২ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৮০৫ জন, এর মধ্যে নারী ও শিশু সহ গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৯৭ জন, ধর্ষণের পর খুন হয়েছেন ৭৫ জন,ধর্ষণের পর আত্মহত্যার ঘটনা  ঘটেছে ১০ জন।২০১১ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৭১১ জন, এর মধ্যে নারী ও শিশু সহ গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৩৯ জন, ধর্ষণের পর খুন হয়েছেন ৯০ জন, ধর্ষণের পর আত্মহত্যার ঘটনা  ঘটেছে ১৩ জন।২০১০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৫৫৯ জন, এর মধ্যে নারী ও শিশু সহ গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২১৪ জন, ধর্ষণের পর খুন হয়েছেন ৯১ জন, ধর্ষণের পর আত্মহত্যার ঘটনা  ঘটেছে জন।              
  
এখানে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় নারী নির্যাতনের সংবাদ আসলে খুব কম সংখ্যকই সংবাদ  মাধ্যমে  আসে ।  শুধু নারী নির্যাতন নয়, স্থানীয় প্রভাবশালীদের কারণে অনেক সংবাদ জনগণের আড়ালেই থাকে, ধামাচাপা পরে যায়। আবার নারী নির্যাতনের অনেক ঘটনা লোকলজ্জার ভয়ে আড়াল হয়ে যায়। আমরা আসলে গণমাধ্যমের কল্যাণে যা দেখি, তা প্রকৃতপক্ষে খুবই সীমিত অংশ।        

যতোই দিন যাচ্ছে সমাজের কিছু বিপথগামী মানুষের জন্য, নারী নির্যাতনের এসব অন্যায় কর্মকাণ্ড বেড়েই চলছে। আর যার প্রভাব পড়ছে গোটা দেশবাসীর ওপর।  দেশ ও জাতির কল্যাণের স্বার্থে  সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় দূর করার উদ্যোগ গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন। অপরদিকে, মানুষের নৈতিক আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের মূল স্তম্ভ হচ্ছে পরিবার । নারী নির্যাতন সহ সমাজের অবক্ষয় রোধে পরিবারের ভূমিকার কোনো তুলনা হয় না। নারী নির্যাতন রোধে একমাত্র পরিবারই সবচেয়ে বেশী ভুমিকা রাখতে পারে। এক্ষেত্রে পরিবারগুলোকে তার অন্তর্নিহিত শক্তি দিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। প্রকৃতপক্ষে, বর্তমান সমাজে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার আধিপত্য সত্ত্বেও পারিবারিক শিক্ষাই শিশুর আচার-ব্যবহার, মন-মানসিকতা, সামাজিকীকরণ ও চরিত্র গঠনে প্রধান ভুমিকা পালন করে থাকে        

তাই নারী নির্যাতন রোধে সবার আগে আমাদের সমাজের প্রচলিত ভুল রীতিনীতিগুলো পরিবর্তন করতে হবে এবং নারীদের প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে হবে। সমাজে নারীকে মানুষ হিসেবে এবং সংসারে নারীকে সম অংশিদারিত্বের মর্যাদা দিতে হবে।এসব মূল্যবোধ জাগ্রত হলে নারী নির্যাতন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনা সম্ভ

মোঃ কামরুজ্জামান 
সাংবাদিক ও  কলাম লেখক।  

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Top Ad

Responsive Ads Here