ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক মার্কিন আশার গুড়ে বালি -সিরাজুল ইসলাম - JONOPRIO24

Breaking

Post Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০১৫

ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক মার্কিন আশার গুড়ে বালি -সিরাজুল ইসলাম

সিরাজুল ইসলাম,তেহরান : ১৯৮০ সালের ৭ এপ্রিল আমেরিকার সঙ্গে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সব ধরনের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর সে সম্পর্ক আর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি। চলতি বছরের ১৪ জুলাই ইরানের সঙ্গে ছয় জাতিগোষ্ঠীর পরমাণু ইস্যুতে চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার পর অনেকেই ধারণা করছেন নতুন করে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে হয়ত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হবে। এ বিষয়ে আমেরিকা বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ওবামার প্রশাসন খুব বেশি আশাবাদী ছিল। এ বিষয়ে সারা বিশ্বের মানুষের মধ্যে এক ধরনের কৌতূহলও রয়েছে। অনেকের ধারণা- আমেরিকার মতো একটি শক্তিশালী দেশের সঙ্গে টক্কর দিয়ে পথ চলা ইরান যখন চুক্তি করেছে তখন হয়ত ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু সে সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা তো দূরের কথা আমেরিকার সঙ্গে যেকোনো বিষয়ে আলোচনা নিষিদ্ধ করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনী। সে কারণে দু দেশের মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ভবিষ্যতের গর্ভে গিয়ে জমা হলো। প্রশ্ন হচ্ছে- কেন আমেরিকার সঙ্গে ইরান কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে চায় না? তার কারণ খুঁজে দেখব এ নিবন্ধে। তবে তার আগে কী কারণে আমেরিকার সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলির ওপর নজর বুলিয়ে নেয়া যাক।  এছাড়া, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা দু দেশের মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কেন নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন তার কারণও জানা জরুরি। জানতে হবে- ইরানে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট থাকার পরও সর্বোচ্চ নেতা কী মার্কিন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় বাধা দিতে পারেন?

কেন ইরান-মার্কিন সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছিল

১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্র
য়ারি ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বে ইরানে ইসলামি বিপ্লব সফল হয়। ওই গণবিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হন মোহাম্মাদ রেজা শাহ পাহলভী। রেজা শাহ ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও শক্তিশালী মিত্র। তার পতনের পর সঙ্গত কারণেই তৎকালীন মার্কিন সরকার নাখোশ হয়। এরপর ওই বছরেরই ৪ নভেম্বর ইরানের একদল ছাত্র তেহরানের মার্কিন দূতাবাসে হামলা চালিয়ে ৫২ জন কূটনীতিক ও দূতাবাস স্টাফকে জিম্মি করে। অভিযোগ করা হয়, মার্কিন দূতাবাসের এসব কর্মকর্তা-কর্মচারী ইরানের ইসলামি বিপ্লবী সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র করছেন এবং ইরানের ভেতরে নানা ধরনের নাশকতামূলক তৎপরতায় ইন্ধন দিচ্ছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র আমেরিকা ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং জিম্মিদের উদ্ধারে তৎকালীন জিমি কার্টার সরকার ইরানের ভেতরে সামরিক অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। সে অনুযায়ী ১৯৮০ সালের ২৪ এপ্রিল রাতের অন্ধকারে পারস্য উপসাগর থেকে মার্কিন বাহিনী অপারেশন ঈগল ক্ল নামে সামরিক অভিযানে হেলিকপ্টার, গানশিপ ও জঙ্গিবিমানের সহায়তায় অভিযান শুরু করে। কিন্তু ইরানের তাবাস মরুভূমিতে প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে পড়ে এসব হেলিকপ্টার, গানশিপ ও জঙ্গিবিমানের বেশিরভাগই অনেকটা অলৌকিকভাবে ধ্বংস হয়। সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ব্যর্থ হয়ে জিম্মি মুক্তির বিষয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয় আমেরিকা এবং ১৯৮১ সালের আলজিয়ার্স চুক্তির মাধ্যমে ইরানের আটক সম্পদ ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রতি দিয়ে জিম্মিদের মুক্তি নিশ্চিত করে। কিন্তু সম্পর্কের উন্নতি তেমন কিছুই হয়নি। ফলে ১৯৮১ সালের ২১ মে থেকে আমেরিকা তেহরানে অবস্থিত সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের মাধ্যমে ইরানে নিজ স্বার্থ রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে। ওইদিন থেকে ইরানও ওয়াশিংটনে পাকিস্তান দূতাবাসের মাধ্যমে আমেরিকায় তার স্বার্থ দেখাশুনা করে।
সম্পর্ক উন্নয়নের পথে যেসব বাধা : ইরান ও আমেরিকার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নানা ধরনের বাধা কাজ করে। তবে এর মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে অনাস্থা ও মর্যাদার বিষয়টি। ইতিহাসের নানা ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে অনাস্থা তৈরি হয়েছে মূলত আমেরিকার কারণে। ১৯৫৩ সালে সেই সময়কার জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মাদ মোসাদ্দেকের নেতৃত্বাধীন সরকারকে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। এ কাজে সহযোগিতা করে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-সিক্স। মোসাদ্দেক সরকার ইরানের তেল কেম্পানিগুলোকে জাতীয়করণ করতে চেয়েছিলেন বলে আমেরিকা অভ্যুত্থান ঘটায়। এরপর স্বৈরশাসক শাহের বিরুদ্ধে যে গণবিপ্লব সংঘটিত হয়, আপন স্বার্থের কারণে তাও মেনে নিতে পারেনি আমেরিকা; চলে নানা ষড়যন্ত্র। অভিযোগ রয়েছে- মার্কিন ষড়যন্ত্রের ফলস্বরূপ ইরানের সংসদে বোমা বিস্ফোরণে ৭২ সংসদ সদস্য নিহত হন। এছাড়া, ইরানের ইসলামি বিপ্লবকে নস্যাৎ করার জন্য ইরাকের একনায়ক সাদ্দাম হোসেনকে ইরানের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয় আমেরিকা যার ফলে আট বছর ধরে চলে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ। এ যুদ্ধে ইরানের লাখ লাখ মানুষ হতাহত এবং প্রচুর সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শুধু তাই নয়, ১৯৮৮ সালে পারস্য উপসাগরের আকাশে ইরানের একটি যাত্রীবাহী বিমানকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে বিধ্বস্ত করে মার্কিন বাহিনী। এতে মারা যায় ইরান ২৯০ যাত্রী যার মধ্যে বহু নারী ও শিশু ছিল। অবশ্য, মার্কিন সরকার হাস্যকর দাবি করেছে- ইরানের জঙ্গিবিমান মনে করে মার্কিন সেনারা তাতে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এছাড়া, ইরানের ইসলামি সরকারকে অস্থিতিশীল ও ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে মার্কিন মদদে গঠিত হয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী
মুজাহিদিনে খাল্ক। এ গোষ্ঠীর সন্ত্রাসীদের হাতে হাজার হাজার ইরানি নাগরিক নিহত হয়েছে।
২০১০ সালের ২৩ ফেব্র
য়ারি ইরানের ওপর দিয়ে দুবাই থেকে কিরগিজস্তানে যাওয়ার পথে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী জুন্দুল্লাহ গোষ্ঠীর নেতা আব্দুল মালেক রিগিকে আটক করে। রিগি ছিল পাকিস্তান ও ইরানের বেলুচিস্তান-ভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জুন্দুল্লাহর নেতা। আটক হওয়ার ২৪ ঘণ্টা আগে রিগি একটি ঘাঁটিতে ছিল এবং য্ক্তুরাষ্ট্র তাকে আফগানিস্তানের জাল পাসপোর্ট তৈরি করে দিয়েছিল। রিগি আদালতে দেয়া বিবৃতিতে জুন্দুল্লাহ গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী তৎপরতার দায়-দায়িত্ব স্বীকার করেছে। একইসঙ্গে সে বলেছিল, তার এসব তৎপরতার মাধ্যমে ইসলামি আইন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। রিগি নিজেকে আদালতে দোষী বলে স্বীকার করে। এর আগে দেয়া স্বীকারোক্তিতে রিগি আফগানিস্তানের ন্যাটো কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কথা স্বীকার করার পাশাপাশি এও  বলেছিল, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং ইসরাইলি গুপ্তচর সংস্থা মোসাদের সাথে তার যোগাযোগ ছিল।
জুন্দুল্লাহ গোষ্ঠী ইরানের মাটিতে অনেক বোমা হামলা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর পিশিনে জুন্দুল্লাহর এক সন্ত্রাসী হামলায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কয়েজন কমান্ডারসহ ৪০ জন নিহত হয়েছিল।
ইরানের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপড়েনের কারণে ৯০-এর দশকে এসে তেহরানের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এখানেই শেষ নয়- পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি বা এনপিটি ভেঙে ইরান সামরিক উদ্দেশে পরমাণু কর্মসূচি পরিচালনা করছে এমন অভিযোগ আনে ২০০২ সালে। পরমাণু ইস্যুতে নিজ প্রভাব খাটিয়ে এবং অন্যদেরকে ভুল বুঝিয়ে ও চাপ সৃষ্টি করে ২০০৬ সালে তেহরানের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আমেরিকা। ২০০৬ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত চার দফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ২০১২ সালে সে নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করা হয়।
এর আগে, ২০০৭ সালে ইরাকের আরবিলে অবস্থিত ইরানি কনস্যুলেটে হামলা করে মার্কিন সেনারা এবং সেখান থেকে ইরানের পাঁচজন স্টাফকে তুলে নিয়ে যায়। ওই বছরই পারস্য উপসাগরে মার্কিন সেনাদের সঙ্গে ইরানি সেনাদের সংঘর্ষ হওয়ার উপক্রম হয়। এ নিয়ে মার্কিন তরফ থেকে যে অভিযোগ করে ভিডিও প্রকাশ করা হয় ইরানি ভিডিও প্রকাশের পর তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। আফগানিস্তান থেকে আল-কায়েদা ও তালেবানের অনেক নেতা ইরানে আশ্রয় নিয়েছে -এমন অভিযোগ করে আমেরিকা। অথচ ইরান তা নাকচ করে বলেছে- আফগানিস্তানের মাজার-ই শরিফে তালেবানের হাতে নিহত হয়েছে ইরানের সাত কূটনীতিক ও এক সাংবাদিক এবং ইরানই বরং তালেবান ও আল-কায়েদার সন্ত্রাসের শিকার।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে আমেরিকা সন্ত্রাসী সংগঠন আখ্যা দিয়েছে এবং এর কমান্ডারদের ওপর ভ্রমণ ও ভিসা নিষেধাজ্ঞাসহ নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। একইভাবে ইরান সমর্থিত লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ফিলিস্তিনের হামাস সংগঠনকেও আমেরিকা সন্ত্রাসী সংগঠন বলে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। এছাড়া, লেবাননের রাজধানী বৈরুতে মার্কিন দূতাবাসে ১৮৮৩ সালে বোমা হামলায় ১৯ জন মার্কিন নাগরিক নিহত হয়। ওই বছরেই লেবাননের জাতিসংঘ ব্যারাকে বোমা হামলায় ২৪১ মার্কিন সেনা নিহত হয়। ১৯৯৬ সালে খোবার টাওয়ারে বোমা হামলার দায়ও হিজবুল্লাহর ওপর চাপিয়েছে আমেরিকা। এসব ঘটনা-ই ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়নের পথে অন্তরায় হয়ে দেখা দিয়েছে।
এখানেই শেষ নয়, দুদেশের মধ্যে অনাস্থা ও অবিশ্বাসের মাত্রা বাড়িয়েছে ২০০৯ সালের ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়কার কিছু ঘটনাবলি। প্রথম দফায় নির্বাচিত হয়ে জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট ড. আহমাদিনেজাদ ইসরাইলকে বিশ্বের মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার কথা বলে রাতারাতি বিশ্ববাসীর নজর কাড়েন। এরপর তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে বক্তৃতা করতে গিয়ে
হলোকাস্ট নিয়ে পাশ্চাত্যের মিথ্যা প্রচারণার অভিযোগ তোলেন। এসব কারণে আমেরিকা প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদকে পছন্দ করত না। ২০০৯ সালে দ্বিতীয় দফা নির্বাচন করার সময় আহমাদিনেজাদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মীর হোসেইন মুসাভিকে কথিত সংস্কারপন্থি প্রার্থী পরিচয়ে গোপনে সমর্থন দেয় আমেরিকা এবং তার মাধ্যমে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। সে সময় ইরানের ভেতরে এমন অবস্থা তৈরি করা হয়েছিল যে, ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব সফল হওয়ার পর এত খারাপ অবস্থা আর কখনো হয়নি। পরে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয় এবং জোরালো অভিযোগ ওঠে- মার্কিন সরকারের কাছ থেকে ১০০ কোটি ডলারের বিনিময়ে মুসাভি ওই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছেন। এখন যেকোনো ইরানি নাগরিক মনে করে- ২০০৯ সালের নির্বাচনে গোলযোগ সৃষ্টির বিষয়টি আমেরিকা করিয়েছে।
এরপর ২০১১ সালের ৪ ডিসেম্বর আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী শহর কাশমারের আকাশ থেকে মার্কিন অত্যাধুনিক ড্রোন আরকিউ-১৭০ সেন্টিনেল কব্জা করে ইরান। ইরানের ওপর গুপ্তচরবৃত্তির জন্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ওই ড্রোন পাঠিয়েছিল। পরের বছর অর্থাৎ ২০১২ সালের নভেম্বের মাসে পারস্য উপসাগরের ইরানি আকাশসীমা থেকে মার্কিন ড্রোন এমকিউ-১কে গুলি করে ভূপাতিত করে ইরানি জঙ্গিবিমান। ২০১৩ সালের ১২ মার্চ আরেকটি এমকিউ-১ ড্রোন ভূপাতিত করে ইরান।
ওপরের এসব ঘটনাসহ আরও নানা কারণে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে মারাত্মক দূরত্ব রয়েছে। এর মধ্যে ১৯৯৭ সালে প্রেসিডেন্ট খাতামি ক্ষমতায় এসে আমেরিকার সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নেন। তবে তা সফল হয়নি এবং দু দেশের মধ্যকার সম্পর্কেও বিশেষ কোনো পরিবর্তন আসেনি। আমেরিকাকে ইরান এতটাই অবিশ্বাস করে যে, সাম্প্রতিক পরমাণু চুক্তির বাইরে আর কোনো বিষয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা করতে রাজি নন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী। এমনকি ইরাক ইস্যু নিয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করতে চাইলেও ইরান তাতে রাজি হয়নি। এসবই হয়েছে সর্বোচ্চ নেতার আদেশ-নিষেধে।

সর্বোচ্চ নেতার মর্যাদা ও ক্ষমতা

প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক- যে নেতা এতকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন তাকে ইরানি সংবিধান কী মর্যাদা ও ক্ষমতা দিয়েছে। ইরানের সংবিধানের অষ্টম পরিচ্ছেদের ১০৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে-
তিনি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে মার্জা ও নেতা হিসেবে গণ্য হবেন এবং বিশেষজ্ঞ পরিষদ কর্তৃক নির্বাচিত হবেন। তবে আইনের চোখে সর্বোচ্চ নেতা ও দেশের সব নাগরিক সমান বলে গণ্য হবেন। ১০৮ অনুচ্ছেদে সর্বোচ্চ নেতার যোগ্যতা ও গুণাবলি নির্দিষ্ট করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে-ফিকাহ বা ইসলামি আইনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাণ্ডিত্য থাকবে। ইসলামি উম্মাহকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য পর্যাপ্ত সততা ও ধর্মপরায়ণতা থাকতে হবে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি, বিচক্ষণ ও সাহসী হওয়া এবং প্রশাসনিক দক্ষতা ও নেতৃত্ব প্রদানের জন্য পর্যাপ্ত সামর্থ্য থাকতে হবে।
১১০ অনুচ্ছেদে সর্বোচ্চ নেতার কর্মপরিধি ও এখতিয়ার নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ পরিষদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সার্বিক নীতি প্রণয়ন করবেন তিনি। সরকারের সার্বিক নীতিমালা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা তা নজরদারি করবেন। গণভোট আয়োজনের নির্দেশনা দেবেন তিনি। ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হবেন সর্বোচ্চ নেতা। যুদ্ধ, সন্ধি ও সেনা সমাবেশের নির্দেশ দেবেন তিনি। এছাড়া, অভিভাবক পরিষদের ফকিহ (ইসলামি আইনজ্ঞ), বিচার বিভাগের প্রধান, ইরানের সম্প্রচার সংস্থার প্রধান, চিফ অব দ্যা জয়েন্ট স্টাফ এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রধান নিয়োগ দেবেন সর্বোচ্চ নেতা। এছাড়া, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের নিয়োগপত্রে সই করবেন তিনি। তিনিই যেকোনো ফতোয়া জারি করার অধিকার রাখেন। উল্লেখ্য, এই ক্ষমতাবলেই মরহুম ইমাম খোমেনী সালমান রুশদির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের ফতোয়া জারি করেছিলেন এবং আজও তা বহাল রয়েছে। বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা পরমাণু বোমা তৈরি, রাখা ও ব্যবহারকে হারাম ঘোষণা করে ফতোয়া জারি করেছেন ২০০৩ সালে।

সম্পর্কে কী ক্ষতি হতে পারে?

ইরান মনে করে, আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হলে মার্কিন সরকার নানা কায়দায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করবে। নানা রকমের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবে এবং অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপ করবে। এর প্রমাণ হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মার্কিন গোয়েন্দাবৃত্তি ও টেলিফোনে আঁড়িপাতার ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। ইরানের নেতারা মনে করেন- মার্কিন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক হলে সামরিক শক্তির খোঁজে নামবে আমেরিকা এবং আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়াই নির্বিঘেœ যেসব সামরিক, বেসামরিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করা সম্ভব হয়েছে তা বাধাগ্রস্ত হবে। ইরানের পরামাণু স্থাপনা, সামরিক স্থাপনা ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর বিশেষ নজরদারির চেষ্টা চালাবে মার্কিন গোয়েন্দারা যা ঠেকাতে ইরানকে রাতদিন ব্যস্ত থাকতে হবে। ২০০৪ সালে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ড সিনেট শুনানিতে বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকার কারণে দেশটি কী ধরনের সামরিক দিক দিয়ে কোথায় রয়েছে এবং কী ধরনের সক্ষমতা অর্জন করেছে সে সম্পর্ক অন্ধকারে রয়েছে পেন্টাগন। 

সিনেটর জন ম্যাককেইনের আহ্বান

মার্কিন সিনেটের প্রতিরক্ষা বিষয়ক কমিটির প্রধান জন ম্যাককেইন ওবামা প্রশাসনের কাছে লেখা এক চিঠিতে ইরানবিরোধী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী
মুজাহিদিনে খাল্ককে উপকারী পরমাণু গোয়েন্দা হিসেবে অভিহিত করে এদের রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। দৈনিক ওয়াশিংটন টাইমসের খবরে বলা হয়েছে- এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে সহায়তা করার মার্কিন প্রতিশ্রতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন সিনেটর ম্যাককেইন। এ ব্যাপারে হোয়াইট হাউসকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি। জন ম্যাককেইন সরকারের কাছে লেখা ওই চিঠিতে আরও বলেছেন, ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইরান-বিরোধী এই গোষ্ঠীর বহু সদস্য ইরাক থেকে আলবেনিয়ায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। এ অবস্থায় মার্কিন সরকারের উচিত এ গোষ্ঠীকে রক্ষার ব্যাপারে দায়িত্ব পালন করা।

মর্যাদার প্রশ্ন বনাম মার্কিন হুমকি

পরমাণু ইস্যু নিয়ে আলোচনার সময় ইরান বার বার বলেছে, আমেরিকা বা পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের আলোচনা হতে হবে সম্মান ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে। তেহরান চায় না আলোচনার টেবিলে বসে কেউ তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করুক কিংবা দিক-নির্দেশনা দিক। ইরান সবসময় বলেছে, তেহরান কারও কাছ থেকে বাড়তি কিছু আশা করে না, আবার কেউ তার ওপর খবরদারি করুক তাও চায় না। কিন্তু আমেরিকা দফায় দফায় ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার হুমকি দিয়ে আসছে। সবসময় দেশটি বলে- আলোচনা ও অন্যান্য ব্যবস্থার পাশাপাশি ওয়াশিংটনের টেবিলে সামরিক হামলার অপশনটি খোলা রয়েছে। ইরানের কাছে এসব হুমকি ও কথাবার্তা অত্যন্ত অমর্যাদাকর বলে গণ্য হয়। এছাড়া, বিপ্লবের পর গত ৩৫ বছরে ইরান বিভিন্ন ক্ষেত্রে কূটনৈতিক উপায়ে মার্কিন কৌশল মোকাবিলা করে অনেক বেশি সফল হয়েছে। এর বিপরীতে আমেরিকা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শক্তির জোরে ইরানকে বশে আনার চেষ্টা করেছে। ইরানের এই কূটনৈতিক সাফল্যও ইরানি নেতাদের শক্ত অবস্থানে যেতে সহায়তা করেছে।   

সর্বোচ্চ নেতার সর্বশেষ অবস্থান


আয়াতুল্লাহ খামেনী গত ৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে সরাসরি বলেছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা নিষিদ্ধ। নানামুখী অসুবিধার কথা চিন্তা করে আমেরিকার সঙ্গে আলোচনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। রাজধানী তেহরানে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ শাখার কমান্ডার ও স্টাফ মেম্বার এবং তাদের পরিবার পরিজনকে দেয়া সাক্ষাত অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। ইরানের যেসব ব্যক্তি আমেরিকার সঙ্গে আলোচনার কথা বলেন তাদের উদ্দেশে আলী খামেনী বলেন, কেউ কেউ চিন্তাভাবনা ছাড়াই অথবা বাস্তবতা না বুঝে শুধু বিশ্বাসী হয়ে আমেরিকার সঙ্গে আলোচনার পক্ষে মত দিচ্ছেন। কিন্তু আমেরিকার সঙ্গে আলোচনা হবে তাদেরকে অনুপ্রবেশের সুযোগ করে দেয়া এবং তাদের ইচ্ছা চাপানোর পথ করে দেয়ার শামিল। তিনি এমনও মনে করেন যে, সাম্রাজ্যবাদীদের মোকাবিলায় রুখে দাঁড়ানোটা মানবতা ও মানবজাতির প্রতি সম্মান দেখানোর শামিল। এছাড়া, মার্কিন বাহিনীকে ইঙ্গিত করে সর্বোচ্চ নেতা জোরালো ভাষায় বলেছেন,
শত্রুরা পারস্য উপসাগরীয় এলাকা ইরানের জন্য অনিরাপদ করে তুলতে চায় কিন্তু বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌশক্তি সে ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেবে এবং শত্রুদের জন্যই পারস্য উপসাগর অনিরাপদ হয়ে পড়বে।
এর আগে, গত ১৮ আগস্ট তিনি বলেছিলেন,
আমেরিকাকে ইরানের ভেতরে অনুপ্রবেশের সুযোগ দেয়া হবে না বরং আমরা নিশ্চিতভাবে তাদের পথ বন্ধ করে দেব। আমরা ইরানের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আমেরিকাকে হস্তক্ষেপ করতে দেব না। আমাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে তাদের অনুপ্রবেশ রুখে দেব। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ঘটনাবলি নিয়ে আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী বলেছেন, নিজের লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমেরিকা এ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় কিন্তু ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ওয়াশিংটনের এ নীতি প্রতিহত করবে। এ অঞ্চলে যারাই ইসরাইলের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে তাদেরকেই ইরান সর্বাত্মক সমর্থন দেবে বলেও তিনি ঘোষণা করেছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এমন মনোভাবের কারণে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, ইরান ও আমেরিকার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক খুব সহজে প্রতিষ্ঠিত হবে না। ইরান দীর্ঘদিন ধরে সুস্পষ্ট ভাষায় বলে আসছে, বিশ্বের প্রধান বলদর্পী শক্তি হচ্ছে আমেরিকা। এই দেশটির সাম্রাজ্যবাদী ও উপনিবেশবাদী নীতির কারণে বিশ্বের বেশিরভাগ সমস্যা তৈরি হয়েছে। আমেরিকা ও ইসরাইল ছাড়া বিশ্বের যেকোনো দেশের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক হতে পারে বলেও বহুবার তেহরান ঘোষণা করেছে। এছাড়া, তেহরান মনে করে- আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমেরিকা হস্তক্ষেপের নীতি অনুসরণ করে আসছে। ইরান এ ধরনের নীতির চরম বিরোধী। আবার ইসরাইলের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কও একটি ফ্যাক্টর। ইরান ইসরাইলকে কোনো বৈধ রাষ্ট্র মনে করে না। অন্যদিকে, ইসরাইলকে অস্ত্র ও অর্থসহ সব ধরনের সমর্থন দিয়ে শক্তিশালী করেছে প্রধানত আমেরিকা। আবার আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইহুদি লবির ব্যাপক প্রভাব রয়েছে যার বাইরে যাওয়া মার্কিন সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে অনেক কঠিন। সর্বোপরি কূটনীতির আড়ালে রয়েছে মার্কিন গুপ্তচরবৃত্তির প্রশ্ন। ফলে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার কূটনৈতিক সম্পর্ক নিকট ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠার কোনো সম্ভাবনা নেই। আমেরিকার সঙ্গে ইরানের বড়জোর বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হতে পারে; কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কথা ভাবা নিতান্তই বাতুলতা।
লেখক : রেডিও তেহরানের সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সূত্র:সাপ্তাহিক ডট কম ।।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Top Ad

Responsive Ads Here