লোরকার খোঁজে স্পেন - JONOPRIO24

Breaking

Post Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

লোরকার খোঁজে স্পেন

মাদ্রিদের প্লাজা ডি সান্তা আনাতে ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার ভাস্কর্য। লোরকা ১৮৯৮ সালের ৫ জুন জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৩৬ সালের ১৯ আগস্ট তাঁকে হত্যা করা হয়।
জনপ্রিয় ডেস্ক  : যুদ্ধের দিনগুলোতে মানুষ হারিয়ে যেতে থাকে। কারও দরজায় টোকা পড়ে। কেউ গুম হয়ে যায়। কাউকে চোখ বেঁধে দাঁড় করিয়ে রাখা হয় প্রকাশ্য ফায়ারিং স্কোয়াডে। দেশে দেশে, যুগে যুগে যেন একই দৃশ্য রচনা হয় বারবার। স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময়ও তা-ই হয়েছিল। স্পেনে ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যেই অন্ততপক্ষে এক লাখ ১৪ হাজার মানুষ নিখোঁজহয়ে যান! সে সময় জেনারেল ফ্রাঙ্কোর ফ্যাসিস্ট বাহিনীর শিকারদের একজন কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা। দুনিয়াজুড়ে তুমুল জনপ্রিয় এই কবির মৃতদেহের সন্ধানে স্পেনে চলছে এক নজিরবিহীন প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান অভিযান। দ্য গার্ডিয়ানে আসফিয়া কাসামের প্রতিবেদন অবলম্বনে জানাচ্ছেন আহমেদ মুনীরুদ্দিন। গ্রানাডার দিকে তাকিয়ে থাকা পাহাড় সারিতে ছোট্ট গ্রাম ভিজনার। গ্রামের ধার দিয়ে পাহাড়ের আরও ভেতরে যাওয়ার পথ। এই পথ-পাশের বিরানভূমির মধ্যেই কোথাও লুকিয়ে আছে স্পেনের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় অতীতের একটা উত্তর। অন্ততপক্ষে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা তাই মনে করছেন। এখন নীল ফিতা দিয়ে ঘিরে রাখা এক টুকরো জমিতে গত মাসের মাঝামাঝি থেকে প্রায় উদয়াস্ত খোঁড়াখুঁড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। আশা করা হচ্ছে কবি-লেখক ও নাট্যকার ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার মরদেহ এখানেই কোথাও আছে! ২০১১ সালে প্রকাশিত এক গবেষকের বইয়ে লোরকার জীবনের অন্তিম মুহূর্তগুলোর বর্ণনার সঙ্গে প্রায় পুরোটই মিলে গেছে ভিজনার গ্রামের জমিন। ফরেনসিক প্রত্নতাত্ত্বিক দলটির প্রধান জাভিয়ার নাভারো দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা যা কিছু করতে পেরেছি তা থেকে প্রায় নিশ্চিত যে, এটাই সেই জায়গা।১৯৩৬ সালের আগস্টে একটা ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে হত্যার পর রক্ত বিয়েএবং বারনার্দা আলবার বাড়ির লেখক লোরকাকে একটা গণকবরে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। লোরকার মৃতদেহ অনুসন্ধান শুরু হয় কয়েক বছর আগে। সে সময় বিশ্বজুড়ে গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হয়েছিল এ খবর। ২০০৭ সালে অতীত মোকাবিলা করা নিয়েস্পেনে বিশেষ আইন পাসের মধ্য দিয়ে ইতিহাস বিষয়ে দেশটিতে যে নতুন চাঞ্চল্য শুরু হয় লোরকার মৃতদেহ অনুসন্ধান তারই ফসল। ২০০৮ সালে দেশটির এক বিচারক জাতির এই গুরুত্বপূর্ণ কবি-লেখকের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত শুরুর নির্দেশ দেন। এরপর লোরকার পরিবারের পক্ষ থেকেও তাঁর মৃতদেহ অনুসন্ধানের বিষয়ে সম্মতি জানানো হলে শুরু হয় এই অনুসন্ধান অভিযান। ২০০৭ সালে স্পেনের তৎকালীন সমাজবাদী সরকার ঐতিহাসিক স্মৃতি আইনপাস করে। এই আইন দেশটির অতীতের ঘটনাবলিকে নতুন আলোতে দেখার এবং তা নিয়ে আলোচনার পথ তৈরি করে দেয়। বিশেষত গৃহযুদ্ধকালের ঘটনাবলি এবং জেনারেল ফ্রাঙ্কোর শাসনামলের চাপা পড়া ইতিহাসের করুণ অধ্যায়টি আলোর মুখ দেখতে শুরু করে। এই আইনের মধ্য দিয়ে স্পেনের বিভিন্ন স্থানে সামরিক স্বৈরশাসক ফ্রাঙ্কো নির্মিত নানা সৌধ এবং নানা প্রতীক সরিয়ে ফেলা হয়। তবে এই আইন সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ সালের গৃহযুদ্ধে প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার মানুষের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ানিয়ে অনুসন্ধানের শুরুতে।
ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা। এই কবির মরদেহ শনাক্ত করতে পারা হয়তো সারা দুনিয়াতেই এমন অনেক যুদ্ধের চাপা পড়া অতীতে মানুষকে আগ্রহী করে তুলতে পারে। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই আইন যতটা আশা জাগিয়েছিল, বাস্তবে অতটা কাজ হচ্ছে না বলে মনে করছেন অনেকেই। ঐতিহাসিক স্মৃতি পুনরুদ্ধার সংঘ’-এর এমিলিও সিলভা এমনটাই মনে করেন। ২০০০ সালে নিজের দাদা এবং তাঁর বেশ কয়েকজন সহযোদ্ধার কবর খুঁজে বের করা নিয়ে আন্দোলন শুরু করে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন সিলভা। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গণকবরগুলোতে মৃতদেহ অনুসন্ধানে সিলভাদের আন্দোলন এখনো চলছে। এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার ৪০০ মৃতদেহের সন্ধান পেয়েছে এই সংগঠনটি। ঐতিহাসিক স্মৃতি আইনপাস করা সমাজবাদী সরকার এমন সংগঠনগুলোকে তহবিল জোগানোর কারণেই এই সাফল্য পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু ২০১১ সালে ডানপন্থী পিপলস পার্টি ক্ষমতায় আসার পর এই আইনের আওতায় এসব তহবিল বন্ধ করে দেওয়া হয়। ইতিহাস নিয়ে অনাগ্রহই অতীত স্মৃতি পুনরুদ্ধারের কাজে বড় বাধা। এ কারণেই তহবিলের বিষয়টিও আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন সিলভা। উদাহরণ হিসেবে মাদ্রিদের বিজয় তোরণের কথা বলেন তিনি। সিলভা বলছিলেন,‘প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের মাত্র ৮০০ মিটার দূরে মাদ্রিদ ভিক্টরি আর্চ। স্পেনের গৃহযুদ্ধে সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল ফ্রাঙ্কোর বিজয় উদযাপনে এই তোরণ নির্মাণ করা হয়েছিল। ফ্রাঙ্কোর মৃত্যুর পর প্রত্যেক প্রধানমন্ত্রীই শতবার এই তোরণ পার হয়েছেন। কিন্তু একটা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে অশুভ অভ্যুত্থানের এমন সৌধের অবস্থান নিয়ে কারও মনেই কোনো প্রশ্ন জাগেনি!
জাতিসংঘের একটা ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রতিনিধি আরিয়েল দুলিতস্কি দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘অতীত নিয়ে এই অনুসন্ধান পরিবারগুলোর দায় হতে পারে না, এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।পাশাপাশি স্বৈরশাসনের আমলে সংঘটিত সব অপরাধের দায়মুক্তি দিয়ে ১৯৭৭ সালে পাস করা আইন বাতিলের জন্যও স্পেনের সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের এ গ্রুপটি। দুলিতস্কি বলেন, ‘এই ক্ষতগুলো খোলা। বলপ্রয়োগে গুমের ঘটনায় আসলে কী কী ঘটেছিল তা না জানা পর্যন্ত এই ক্ষত জ্বলতেই থাকবে। এই ক্ষত কখনোই হারাবে না।এই পরিস্থিতিতে জনপ্রিয় কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার মরদেহ শনাক্ত করতে পারলে তা নিশ্চয়ই স্পেনের চাপা দেওয়া গৃহযুদ্ধের অতীতকে নতুন করে নাড়া দেবে। তবে জেনারেল ফ্রাঙ্কোর দীর্ঘ স্বৈরশাসনামলের ঘটনাবলি আলোচনায় না আনলেও কেবল কয়েক বছরের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের ক্ষতই বিপুল। যে যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মানুষকে দুই হাজারের মতো গণকবরে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে। প্রায় সোয়া লাখ মানুষ নিখোঁজ বা গুম হয়েছে।লোরকার মরদেহ হয়তো সারা দুনিয়াতেই এমন অনেক যুদ্ধের চাপা পড়া অতীতে মানুষকে আগ্রহী করে তুলতে পারে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সহযোগী আলবদর ও রাজাকারেরা বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ঘটায়। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের বেশির ভাগেরই মরদেহ শনাক্ত করা যায়নি। আলাদাভাবে তাঁদের সমাহিতও করা যায়নি। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে নিখোঁজ হন চলচ্চিত্র নির্মাতা-লেখক জহির রায়হান। তাঁর অন্তর্ধান রহস্যের স্পষ্ট সুরাহা আজ পর্যন্ত হয়নি। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত জহির রায়হানকে খুঁজে না পেলেও লোরকাকে খুঁজে পেতে স্পেনের মানুষেরা সাধ্যের সর্বোচ্চ চেষ্টাই করছে ।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Top Ad

Responsive Ads Here