হুমকিতে আবাসনশিল্প - JONOPRIO24

Breaking

Post Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

মঙ্গলবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৪

হুমকিতে আবাসনশিল্প

দুলাল হোসেন মৃধা : জমির উচ্চমূল্য, নির্মিত ফ্যাট বিক্রি না হওয়া, নকশা অনুমোদন ও গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে বিড়ম্বনা, ক্রেতাপর্যায়ে ঋণসুবিধার অভাবসহ নানা সমস্যায় আবাসন সংকটে পড়েছে। ফলে আবাসন খাতে বিনিয়োগ করা প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা এখন ঝুঁকির মুখে। এ ব্যবসায় বিনিয়োগকারী অনেকের দেউলিয়া হওয়ার দশা। এ অবস্থায় এ খাতের গতি ফেরাতে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) সরকারের সহায়তা চাওয়ার পাশাপাশি দেশ-বিদেশে আবাসন মেলা করেও আশানুরূপ ফল পাচ্ছে না। রিহ্যাবের সূত্র অনুযায়ী, ‘পরিকল্পিত নগরায়ণ ও সবার জন্য সুন্দর আবাসনএ নীতি সামনে রেখে কাজ করছেন আবাসন ব্যবসায়ীরা। ১৯৯১ সালে ১১ ব্যবসায়ী গঠন করেন রিহ্যাব। বর্তমানে সদস্য সংখ্যা ১ হাজার ২শর বেশি। রিহ্যাবের সদস্য হয়নি এমন আবাসন ব্যবসায়ী আছেন আরও ৭-৮শর মতো। সব মিলিয়ে আবাসন ব্যবসায় জড়িত প্রায় ২ হাজার ব্যবসায়ী। রিহ্যাবের সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোই ২০ বছরে ১ লাখ ৬৪ হাজার ফ্যাট হস্তান্তর করে। প্রতি বছর এসব প্রতিষ্ঠান প্রায় ১০ হাজার ফ্যাট এবং ৫ হাজার প¬ট হস্তান্তর করত। কিন্তু ৩ বছর ধরে আবাসন খাতে দুরবস্থা চলছে। যেখানে রিহ্যাবের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো বছরে ১০ হাজার ফ্যাট বিক্রি করত, সেখানে ২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৩ বছরে হস্তান্তর করেছে মাত্র ৫ হাজার ৬৩৩টি ফ্যাট। ২০০৯ সালে ফ্যাট-প¬ট বিক্রি ছিল রমরমা। তখন থেকেই আবাসন খাতে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়তে থাকে। ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে আবাসন খাতে বরাদ্দ রাখা ঋণ স্কিম বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর ২০১০ সালের ২১ জুলাই হঠাৎ করে আবাসন খাতে সব ধরনের নতুন সংযোগ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকে ২০১৩ সালের ২০ জুন পর্যন্ত। এ সময়ে ডেভেলপার কোম্পানি ফ্যাট নির্মাণ করলেও গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। তখন থেকেই কমতে থাকে ক্রেতার সংখ্যা। এরপর ২০১০ সালে শেয়ারবাজারে ধস শুরু হলে এর প্রভাব পড়ে আবাসন খাতেও। ২০১১ সাল থেকে আবাসন খাতে ধীরে-ধীরে বিপর্যয় নেমে আসতে শুরু করে, যা ২০১২ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রকট আকার ধারণ করে। এ দুর্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঢাকার ডিটেইল এরিয়া প্যাযান (ড্যাপ)। ড্যাপের শর্তপূরণ করতে না পারায় কোনো আবাসন কোম্পানির প¬ট প্রকল্পকে অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না। অননুমোদিত প্রকল্পে জমি (প¬ট) কেনা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ইচ্ছা থাকলেও অননুমোদিত প্রকল্পে প¬ট কিনতে ভয় পাচ্ছেন আগ্রহীরা। আবার প্রকল্পের অনুমোদন না পাওয়ায় প্রকল্পের উন্নয়নকাজও সম্পন্ন করে বিক্রীত প¬ট ক্রেতাদের মাঝে হস্তান্তর করতে পারছেন না কোম্পানি মালিকরা। আবাসন খাতের দুর্যোগ ঠেকাতে এবং এ ব্যবসার গতি ফিরিয়ে আনতে সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা চেয়ে একাধিক বৈঠক করেন রিহ্যাব নেতারা। রিহ্যাবের নেতাদের দাবির কারণে সরকার জাতীয় বাজেটে (২০১৩-১৪) আগের বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ করহ্রাস এবং ফ্যাট ক্রয়েরেে ত্র কর দিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ (কালো টাকা) বিনিয়োগ করার সুযোগ রাখে। ওই সুযোগ দেওয়ার ফলে ফ্যাট-প¬ট বিক্রি কিছুটা চাঙ্গা হবে বলে আশা করেছিলেন আবাসন ব্যবসায়ীসহ রিহ্যাব নেতারা। কিন্তু তাদের আশার আলোয় বাদ সাধে ২০১৩ সালের হরতাল-অবরোধসহ রাজনৈতিক অস্থিরতা। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ফ্যাট-প¬ট বিক্রিই বন্ধ থাকেনি, বন্ধ থাকে নির্মাণকাজও। ফলে আবারও বিপর্যয় নেমে আসে। বিপদে পড়েন ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া ৩৩৮টি আবাসন কোম্পানির মালিক। যাদের ২১ হাজার ৫০৬ কোটি ৩৬ লাখ ৭৫ হাজার ১১১ টাকা মূল্যের ২২ হাজার ৫৭২টি ফ্যাট অবিক্রীত অবস্থায় রয়েছে। আবাসন খাতের বিপর্যয় ঠেকিয়ে এ খাতের গতি ফিরিয়ে আনতে জাতীয় বাজেটে নিবন্ধন কর হ্রাস, ক্রেতাপর্যায়ে ঋণ প্রদান, নকশা অনুমোদনসহ ছাড়পত্র প্রক্রিয়া সহজতর করতে ওয়ানস্টপ সেন্টার চালুর দাবিতে সরকারের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেন রিহ্যাব নেতারা। আবাসন ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে সরকার জাতীয় বাজেটে (২০১৪-১৫) ফ্যাট-প¬ট ক্রয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ (কালো টাকা) বিনিয়োগের সুযোগ দিলেও বাড়িয়ে দেয় রেজিস্ট্রেশন ফিসহ অন্যান্য ট্যাক্স। চলতি বছরের ৪ মে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান গোলাম হোসেনের সঙ্গে রিহ্যাব নেতারা প্রাক-বাজেট আলোচনায় বসেন। বৈঠকে রিহ্যাব নেতারা ফ্যাট-প্লট রেজিস্ট্রেশন ফি, গেইন ট্যাক্স স্ট্যাম্প ও মূল্য সংযোজন করসহ মোট রেজিস্ট্রেশন ব্যয় শতকরা ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে জাতীয় বাজেটে (২০১৪-১৫) শতকরা ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ করার দাবি জানান। বৈঠকে গৃহায়ণ শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, ক্যাপিটাল মেশিনারিজ, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রপাতি এবং বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় জেনারেটর আমদানিতে স্বল্প শুল্ক ধার্য করায় সরকারের কাছে আবেদন জানানো হয়। কিন্তু জাতীয় বাজেটে (২০১৪-১৫) রেজিস্ট্রেশন ব্যয় না কমিয়ে উল্টো বাড়িয়ে দিয়েছে। রেজিস্ট্রেশন ব্যয় বাড়ানোর কারণে আবাসন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে বর্ধিত রেজিস্ট্রেশন ব্যয় কার্যকর হওয়ায় ফ্যাটের রেজিস্ট্রেশন ব্যয় আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। আবাসন ব্যবসায়ীরা বলেন, রেজিস্ট্রেশন ফি ও কর বাড়ানোয় ফ্যাট-প¬ট বিক্রির ক্ষেত্রে গেইন ট্যাক্স বৃদ্ধির ফলে ফ্যাট ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সরকার গৃহায়ণ শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানির শুল্ক হ্রাসে কোনো প্রদপে নেয়নি।
ঢাকা মহানগরীতে ফ্যাট তৈরি করতে মোট খরচের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ চলে যায় জমি কেনায়। উচ্চমূল্যে জমি কেনে ভবন নির্মাণ করে গ্রাহক না পাওয়ায় অধিকাংশ ফ্যাট অবিক্রীত থাকে। এতে ুদ্র ও মাঝারিমানের প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি তিগ্রস্ত হয়।
রিহ্যাবের তথ্য অনুযায়ীÑ চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ৩৩৮টি কোম্পানির অবিক্রীত ফ্যাটের সংখ্যা ২২ হাজার ৫৭২টি। এর মধ্যে চলতি বছর অক্টোবর পর্যন্ত ১৮৭টি কোম্পানি ১ হাজার ৭১৭টি ফ্যাট বিক্রি করেছে। একই সময়ে আরও প্রায় ৩ হাজার নতুন ফ্যাট নির্মাণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে চলতি বছর অবিক্রীত ফ্যাটের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪ হাজার। সব ব্যবসায়ীর সদস্যের অবিক্রীত ফ্যাটের সংখ্যা হিসাব করলে এ সংখ্যা আরও বাড়বে বলে জানান তারা। ক্রেতা না থাকায় এসব ফ্যাট এখন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মালিকদের কাছে গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া, মালিক-কর্মকর্তা-শ্রমিকদের হতাহত করা, চাঁদাবাজি, হামলা-মামলাসহ নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন আবাসন ব্যবসায়ীরা। আবাসন খাতের সব ধরনের হয়রানি বন্ধে রিহ্যাব নেতারা স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছে আবেদনও করেন। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি সকালে রাজধানীর সচিবালয়ের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে রিহ্যাব নেতারা এ আবেদন জানান। বৈঠকে রিহ্যাবের প থেকে লিখিতভাবে প্রতিমন্ত্রীর কাছে ২ দফা প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রস্তাবে বলা হয়Ñ রিহ্যাবের সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি, হুমকি ও হয়রানিমূলক মামলা সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও রিহ্যাবের সমন্বয়ে এককেন্দ্রিক সেবা সেল গঠন এবং রিহ্যাব সদস্য প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার অভিযোগ উঠলে তা রিহ্যাবের কাস্টমার সার্ভিস ও মেডিয়েশন সেলকে অবহিত করা।
নকশা অনুমোদনে জটিলতা কাটছে না : ঢাকার ডিটেইল এরিয়া  প্যানের (ড্যাপ) আওতাধীন এলাকায় ইমারতের নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল, দীর্ঘমেয়াদি ও ঝামেলাপূর্ণ। ইমারতের নির্মাণ সংক্রান্ত বিভিন্ন দপ্তরের ছাড়পত্র ও নকশার অনুমোদন পেতে জটিলতার শেষ নেই। আবাসন ব্যবসায়ীরা বলেন, ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান আর জমি মালিকরা মিলে ইমারত নির্মাণ করেন। জমি মালিককে নির্দিষ্টসংখ্যক ফ্যাট দেওয়ার সঙ্গে চুক্তিকালে সাইনিং মানি হিসেবে দিতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা। চুক্তিতে নির্দিষ্ট সময়ে ইমারত নির্মাণ করতে ব্যর্থ না হলে জমি মালিককে মাসে মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়ার বিষয়টি উলে¬খ করা থাকে। কিন্তু ইমারতের নির্মাণ সংক্রান্ত বিভিন্ন দপ্তরের ছাড়পত্রসহ রাজউক থেকে নকশার অনুমোদন পেতেই বছর পেরিয়ে যায়। এ কারণে আবাসন ব্যবসায়ী নেতারা দীর্ঘদিন ধরে নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়াকে সহজ করতে ওয়ানস্টপ সার্ভিস সেন্টার এবং জোনিং পদ্ধতি চালুর জন্য সরকারের কাছে জানিয়ে আসছেন। ৩ জুলাই দুপুরে বিষয়টি নিয়ে বৈঠক করেছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে।
নকশার অনুমোদন বিষয়ে জানতে চাইলে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, ইমারত নির্মাণে নকশার অনুমোদনে ওয়ানস্টপ সার্ভিস সেন্টার এবং জোনিং পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ওয়ানস্টপ সেন্টার হলে নকশার অনুমোদন পেতে আবেদনকারীদের কষ্ট করতে হবে না। আর জোনিং পদ্ধতি চালু করা গেলে কোনো এলাকায় হাইরাইজ ভবন হবে তা নির্ধারিত হয়ে যাবে। ঢাকা ও এর আশপাশে হাইরাইজ ভবন হলে সবার জন্য আবাসনসরকারের এ  স্লোগান বাস্তবে রূপ পাবে।

রিহ্যাব সহ-সভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া এ বিষয়ে বলেন, পরিকল্পিত নগরায়ণ ও দেশের মানুষের আবাসন সমস্যার সমাধানে কাজ করছি আমরা। কিন্তু এ কাজ করতে গিয়ে এখন আবাসন ব্যবসায়ীরা মহাসংকটে পড়ছে। এ অবস্থা দূর করতে সরকারকে স্বল্পসুদে ঋণ দিতে হবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Top Ad

Responsive Ads Here